সোনার তরী কবিতাটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর একটি বিখ্যাত ও গভীর অর্থবহ সৃষ্টি। এই কবিতায় জীবনের আশা, পরিশ্রম এবং অপূর্ণতার এক সুন্দর চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। কবি এখানে মানুষের জীবনের সংগ্রাম এবং সেই সংগ্রামের ফল হারানোর বেদনা খুব সহজ ভাষায় প্রকাশ করেছেন।
কবিতার মূল ভাব হলো—আমরা সারাজীবন যা সংগ্রহ করি, তা সব সময় নিজের কাছে থাকে না। অনেক সময় জীবনের “সোনার ফসল” অন্য কারও হাতে চলে যায়, আর আমরা শূন্য হাতে থেকে যাই। এই কবিতা আমাদের জীবনের বাস্তবতা এবং অনুভূতির গভীর সত্যকে মনে করিয়ে দেয়।
সোনার তরী
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।
রাশি রাশি ভারা ভারা
ধান কাটা হল সারা,
ভরা নদী ক্ষুরধারা
খরপরশা।
কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা।
চারি দিকে বাঁকা জল করিছে খেলা।
পরপারে দেখি আঁকা
তরুছায়ামসীমাখা
গ্রামখানি মেঘে ঢাকা
প্রভাতবেলা–
এ পারেতে ছোটো খেত, আমি একেলা।
দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।
ভরা-পালে চলে যায়,
কোনো দিকে নাহি চায়,
ঢেউগুলি নিরুপায়
ভাঙে দু-ধারে–
দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।
বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে এসে।
যেয়ো যেথা যেতে চাও,
যারে খুশি তারে দাও,
শুধু তুমি নিয়ে যাও
ক্ষণিক হেসে
আমার সোনার ধান কূলেতে এসে।
আর আছে?– আর নাই, দিয়েছি ভরে।
এতকাল নদীকূলে
যাহা লয়ে ছিনু ভুলে
সকলি দিলাম তুলে
থরে বিথরে–
এখন আমারে লহ করুণা করে।
আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।
শ্রাবণগগন ঘিরে
ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,
শূন্য নদীর তীরে
রহিনু পড়ি–
যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।
