প্রেম কখনও কখনও মানুষকে বাঁচায়, আবার কখনও এমন এক অন্ধকারে নিয়ে যায়, যেখান থেকে ফিরে আসার পথ থাকে না।
বৃষ্টি হচ্ছিল।
সেপ্টেম্বরের শেষের সেই রাতটায় শহরটা যেন নিজের সমস্ত আলো নিভিয়ে দিয়েছিল। রাস্তার দু’ধারে ল্যাম্পপোস্ট জ্বলছিল ঠিকই, কিন্তু বৃষ্টির পর্দার ওপারে তাদের আলো কেবল অস্পষ্ট হলুদ দাগ হয়ে দেখা যাচ্ছিল।
রাত তখন ১১টা ৪৭।
শহরের সবচেয়ে পুরোনো রেলস্টেশনের শেষ প্ল্যাটফর্মে একা দাঁড়িয়ে ছিল অদ্রিজা।
কালো শাড়ি।
ভেজা চুল।
হাতে একটা পুরোনো বাদামি খাম।
আর চোখে এমন এক অপেক্ষা, যার শেষ সে নিজেও জানত না।
তার সামনে দিয়ে শেষ লোকাল ট্রেনটা চলে গেল।
ট্রেনের জানালাগুলোতে এক মুহূর্তের জন্য মানুষের মুখগুলো ভেসে উঠল। তারপর অন্ধকার।
অদ্রিজা ঘড়ির দিকে তাকাল।
১১টা ৪৯।
সে ফিসফিস করে বলল,
— “তুমি আসবে তো, অর্ণব?”
কোনও উত্তর এল না।
শুধু দূরে বজ্রপাত হল।
তারপর ফোনটা কেঁপে উঠল।
অদ্রিজা দ্রুত ফোন বের করল।
একটা অচেনা নম্বর।
মেসেজ মাত্র এক লাইন—
“তুমি যদি আজ রাত বারোটার আগে সত্যিটা জানতে চাও, তাহলে পুরোনো গুদামঘরে এসো। একা। অর্ণবকে সঙ্গে আনবে না।”
অদ্রিজার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
অর্ণব।
নামটা দেখলেই তার ভেতরে একসঙ্গে দুটো অনুভূতি জেগে উঠত—ভালোবাসা আর ভয়।
কারণ অর্ণবকে সে ভালোবাসত।
অস্বাভাবিক রকম ভালোবাসত।
কিন্তু গত তিন মাস ধরে অর্ণব তার কাছ থেকে এমন কিছু লুকিয়ে রেখেছিল, যার জন্য তাদের সম্পর্ক ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্ছিল।
তিন মাস আগে পর্যন্ত অর্ণব ছিল তার পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ মানুষ।
এখন সেই মানুষটাকেই সে সবচেয়ে বেশি সন্দেহ করত।
১. প্রথম দেখা
দু’বছর আগে।
কলকাতার এক পুরোনো বইয়ের দোকানে প্রথম দেখা হয়েছিল তাদের।
সেদিনও বৃষ্টি হচ্ছিল।
অদ্রিজা একটা পুরোনো উপন্যাস খুঁজছিল। দোকানের ওপরের তাক থেকে বই নামাতে গিয়ে হঠাৎ একটা বই তার হাত থেকে পড়ে যায়।
বইটা মাটিতে পড়ার আগেই একজন সেটা ধরে ফেলেছিল।
অদ্রিজা তাকিয়ে দেখেছিল একজন লম্বা যুবক দাঁড়িয়ে আছে।
সাদা শার্ট।
কালো ঘড়ি।
চোখে অদ্ভুত শান্ত একটা দৃষ্টি।
ছেলেটা বইটা এগিয়ে দিয়ে বলেছিল,
— “আপনার বই।”
অদ্রিজা বইটা নিতে নিতে বলেছিল,
— “ধন্যবাদ।”
— “আপনি বই পড়েন?”
অদ্রিজা ভুরু কুঁচকে তাকিয়েছিল।
— “বইয়ের দোকানে এসে বই কিনছি। তাহলে কী কিনতে এসেছি বলে মনে হয়?”
ছেলেটা হেসে ফেলেছিল।
— “ঠিক বলেছেন। প্রশ্নটা বোকা ছিল।”
অদ্রিজা প্রথমবার তার হাসিটা দেখেছিল।
সেই হাসির মধ্যে কোনও বাড়াবাড়ি ছিল না।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে সেটা মনে থেকে গিয়েছিল।
ছেলেটার নাম অর্ণব।
পরের এক ঘণ্টা তারা একই দোকানে দাঁড়িয়ে বই নিয়ে কথা বলেছিল।
প্রথমে সাহিত্য।
তারপর সিনেমা।
তারপর গান।
তারপর জীবন।
অদ্রিজা জানত না কীভাবে একজন অপরিচিত মানুষের সঙ্গে এত সহজে কথা বলা যায়।
দোকান বন্ধ হওয়ার সময় অর্ণব বলেছিল,
— “আপনি চাইলে একটা কফি খেতে যেতে পারেন।”
অদ্রিজা হেসে বলেছিল,
— “আমি সাধারণত অপরিচিত ছেলেদের সঙ্গে কফি খেতে যাই না।”
অর্ণব মাথা নেড়ে বলেছিল,
— “ঠিক আছে। তাহলে আজ থেকে পরিচিত হলাম।”
সেই মুহূর্তে অদ্রিজা বুঝতে পারেনি—
এই মানুষটাই একদিন তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভালোবাসা হবে।
আর সেই মানুষটার জন্যই একদিন তাকে নিজের জীবন নিয়ে সন্দেহ করতে হবে।
২. ভালোবাসার শুরু
তাদের সম্পর্ক খুব দ্রুত গভীর হয়ে গিয়েছিল।
অর্ণব কখনও বড় বড় কথা বলত না।
বরং ছোট ছোট জিনিস করত।
অদ্রিজা ক্লান্ত হলে চুপচাপ পাশে বসে থাকত।
অদ্রিজা রাগ করলে তর্ক না করে বলত,
— “রাগটা শেষ হলে আমাকে ফোন কোরো। আমি থাকব।”
অদ্রিজা অসুস্থ হলে রাত জেগে তার খবর নিত।
আর যখন অদ্রিজা বলত,
— “তুমি আমাকে এত ভালোবাসো কেন?”
অর্ণব তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলত,
— “জানি না। তোমাকে দেখার পর থেকে অন্য কাউকে ভালোবাসার কথা মাথায়ই আসেনি।”
এই কথাগুলো অদ্রিজার কাছে শুধু কথা ছিল না।
এগুলো ছিল তার নিরাপত্তা।
তার বাড়ি।
তার ভবিষ্যৎ।
এক রাতে তারা ছাদের ওপর বসে ছিল।
শহরের আলো নিচে জ্বলছিল।
অদ্রিজা অর্ণবের কাঁধে মাথা রেখেছিল।
অর্ণব তার হাতটা ধরে রেখেছিল।
অদ্রিজা ধীরে বলেছিল,
— “যদি কোনওদিন আমাকে ছেড়ে চলে যাও?”
অর্ণব তার দিকে ঘুরে তাকিয়েছিল।
— “তুমি কি আমাকে যেতে দেবে?”
অদ্রিজা কিছু বলেনি।
অর্ণব তার কপালে খুব ধীরে একটা চুমু দিয়েছিল।
— “আমি কোথাও যাচ্ছি না।”
সেই রাতের পর অদ্রিজা বিশ্বাস করেছিল—
অর্ণব তার।
চিরদিনের জন্য।
কিন্তু মানুষ ভবিষ্যৎ জানে না।
৩. যে রাত সব বদলে দিল
তিন মাস আগে।
রাত সাড়ে দশটা।
অদ্রিজা অর্ণবের ফ্ল্যাটে গিয়েছিল।
অর্ণব তখন বাড়িতে ছিল না।
দরজা খোলা ছিল।
সে ভেতরে ঢুকে অপেক্ষা করছিল।
হঠাৎ ফোন বেজে উঠল।
অর্ণবের ফোন।
টেবিলের ওপর রাখা।
স্ক্রিনে একটা মেসেজ ভেসে উঠল—
“তুমি ওকে এখনও সত্যিটা বলোনি?”
অদ্রিজার বুক ধক করে উঠল।
সে ফোনটা হাতে নেয়নি।
কিন্তু পরের মেসেজটা স্ক্রিনেই দেখা গেল।
“অদ্রিজা জানলে ও তোমাকে কখনও ক্ষমা করবে না।”
সেদিন অর্ণব ফিরে আসার পর অদ্রিজা কিছু বলেনি।
শুধু জিজ্ঞেস করেছিল,
— “আমার কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছ?”
অর্ণব কয়েক সেকেন্ড চুপ করে ছিল।
তারপর বলেছিল,
— “না।”
সেই একটা মিথ্যে অদ্রিজার ভিতরটা ভেঙে দিয়েছিল।
কারণ অর্ণবের চোখ তখন তার চোখের দিকে ছিল না।
সেদিনের পর থেকে অর্ণব বদলে গেল।
ফোন লুকিয়ে রাখতে শুরু করল।
রাতে বাইরে যেতে শুরু করল।
কখনও কখনও ঘণ্টার পর ঘণ্টা নিখোঁজ থাকত।
আর অদ্রিজা যত প্রশ্ন করত, অর্ণব তত চুপ হয়ে যেত।
শেষ পর্যন্ত একদিন অদ্রিজা বলেছিল,
— “তুমি আমাকে আর ভালোবাসো না?”
অর্ণব তার দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ কিছু বলেনি।
তারপর বলেছিল,
— “ভালোবাসি।”
— “তাহলে আমাকে সত্যিটা বলছ না কেন?”
অর্ণব চোখ নামিয়ে বলেছিল,
— “কারণ সত্যিটা জানলে তুমি আমাকে হারাবে।”
সেদিন অদ্রিজা কেঁদেছিল।
অর্ণব তাকে জড়িয়ে ধরেছিল।
তার বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে অদ্রিজা ফিসফিস করে বলেছিল,
— “আমি তোমাকে হারাতে চাই না।”
অর্ণব তার চুলে হাত বুলিয়ে বলেছিল,
— “আমিও না।”
কিন্তু সে রাতে অর্ণবের চোখে অদ্রিজা এমন একটা ভয় দেখেছিল—
যে ভয় কোনও সম্পর্ক হারানোর ভয় ছিল না।
যেন সে মৃত্যুকে দেখছে।
৪. বর্তমান
রাত ১১টা ৫৫।
অদ্রিজা এখনও স্টেশনে দাঁড়িয়ে।
অচেনা নম্বর থেকে আবার মেসেজ এল।
“আর পাঁচ মিনিট। তুমি যদি আসতে চাও, এখনই বের হও।”
তারপর একটা লোকেশন।
পুরোনো নদীর ধারের গুদামঘর।
অদ্রিজা জানত জায়গাটা।
বছরের পর বছর বন্ধ পড়ে আছে।
লোকজন বলে সেখানে রাতে কেউ যায় না।
অদ্রিজার মনে হল এটা ফাঁদ হতে পারে।
তবু সে গেল।
কারণ মেসেজের শেষ লাইনটা এখনও তার মাথায় ঘুরছিল—
“অর্ণব তোমাকে যা বলেছে, তার অর্ধেকও সত্যি নয়।”
৫. গুদামঘর
গুদামঘরের দরজা আধখোলা ছিল।
অদ্রিজা ভেতরে ঢুকল।
চারপাশে অন্ধকার।
ভাঙা জানালা দিয়ে বৃষ্টির জল ঢুকছে।
পুরোনো কাঠের গন্ধ।
দূরে কোথাও পানির টুপটাপ শব্দ।
— “কেউ আছেন?”
কোনও উত্তর নেই।
অদ্রিজা আরও কয়েক পা এগোল।
হঠাৎ পিছন থেকে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ।
সে ঘুরে দাঁড়াল।
— “কে?”
অন্ধকার থেকে একটা পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এল।
— “তুমি আসবে জানতাম।”
অদ্রিজার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
লোকটা ধীরে ধীরে আলোয় এল।
অদ্রিজা তাকে দেখে স্থির হয়ে গেল।
— “আপনি?”
লোকটা মৃদু হাসল।
— “অনেকদিন পর দেখা।”
অদ্রিজা এক পা পিছিয়ে গেল।
কারণ লোকটাকে সে চিনত।
আর এই মানুষটাকে মৃত বলে সে নিজে দেখেছিল।
দু’বছর আগে।
অর্ণবের জীবনে অদ্রিজা আসার ঠিক আগে।
লোকটা বলল,
— “অর্ণব তোমাকে বলেছিল আমি মারা গেছি।”
অদ্রিজার ঠোঁট কাঁপতে লাগল।
— “আপনি… বেঁচে আছেন?”
— “হ্যাঁ।”
— “কিন্তু…”
লোকটা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “তোমাকে একটা প্রশ্ন করতে হবে।”
অদ্রিজা কিছু বলতে পারল না।
— “তুমি কি জানো অর্ণব কে?”
— “অর্ণব আমার কাছে কে, সেটা আমি জানি।”
লোকটা ধীরে মাথা নাড়ল।
— “না। তুমি জানো না।”
সে পকেট থেকে একটা ছবি বের করল।
অদ্রিজার দিকে বাড়িয়ে দিল।
ছবিটা হাতে নিয়ে অদ্রিজা প্রথমে কিছু বুঝতে পারল না।
তারপর ছবির পেছনে লেখা তারিখটা দেখল।
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৪।
ছবিতে অর্ণব দাঁড়িয়ে আছে।
তার পাশে সেই লোকটা।
আর তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে—
অদ্রিজা নিজেই।
কিন্তু ছবিটা অসম্ভব।
কারণ সেই তারিখে অদ্রিজা অর্ণবকে চিনতই না।
৬. ছবির রহস্য
অদ্রিজার হাত কাঁপছিল।
— “এটা কীভাবে সম্ভব?”
লোকটা চুপ করে ছিল।
— “এটা নকল।”
— “তুমি নিশ্চিত?”
— “হ্যাঁ।”
— “তাহলে ছবিটা তৈরি করেছে কে?”
লোকটা এবার খুব ধীরে বলল,
— “অর্ণব।”
অদ্রিজা মাথা নাড়ল।
— “না।”
— “কেন?”
— “কারণ অর্ণব আমাকে ভালোবাসে।”
লোকটা মৃদু হেসে বলল,
— “ভালোবাসা আর সত্যি—দুটো সবসময় এক জিনিস নয়।”
অদ্রিজা ছবিটা শক্ত করে ধরে বলল,
— “আপনি আমাকে কী বলতে চাইছেন?”
লোকটা উত্তর দিল না।
বরং বলল,
— “আজ রাত বারোটায় তোমার সঙ্গে এমন একজনের দেখা হবে, যে তোমাকে গত দুই বছর ধরে নজরে রেখেছে।”
অদ্রিজার বুক কেঁপে উঠল।
— “কে?”
লোকটা ঘড়ির দিকে তাকাল।
১১টা ৫৯।
সে বলল,
— “আর এক মিনিট।”
ঠিক তখনই বাইরে একটা গাড়ির শব্দ হল।
লোকটা জানালার দিকে তাকাল।
তার মুখের রং বদলে গেল।
— “ও এসে গেছে।”
— “কে?”
লোকটা উত্তর দিল না।
হঠাৎ গুদামঘরের বাইরে গাড়ির দরজা বন্ধ হল।
তারপর পায়ের শব্দ।
একজন।
দু’জন।
তারপর আরও কয়েকজন।
লোকটা অদ্রিজার হাত ধরে বলল,
— “এখন তুমি আমার কথা শুনবে।”
অদ্রিজা হাত ছাড়িয়ে নিতে চাইল।
— “আপনি কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন?”
— “তোমাকে বাঁচাতে।”
ঠিক তখনই দরজায় একটা ছায়া দেখা গেল।
অদ্রিজা সেই ছায়া চিনতে পারল।
তার বুকের ভেতর যেন কেউ ছুরি চালিয়ে দিল।
— “অর্ণব…”
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল অর্ণব।
ভেজা চুল।
কালো শার্ট।
চোখে সেই পরিচিত দৃষ্টি।
কিন্তু আজ সেই চোখে ভালোবাসা ছিল না।
ছিল ভয়।
আর তার হাতে ছিল একটা বন্দুক।
অদ্রিজা স্তব্ধ হয়ে গেল।
অর্ণব ধীরে বলল,
— “অদ্রিজা, আমার কাছে এসো।”
অদ্রিজা এক পা-ও নড়ল না।
— “তুমি আমাকে মিথ্যে বলেছ।”
অর্ণবের চোখ বন্ধ হয়ে গেল।
— “আমি জানি।”
— “ছবিটা কী?”
অর্ণব চুপ।
— “ও কে?”
চুপ।
— “আমাকে কেন অনুসরণ করা হচ্ছে?”
অর্ণব এবার তার দিকে তাকাল।
তার গলায় কাঁপন।
— “কারণ তুমি এমন একটা জিনিস জানো, যেটা তুমি নিজেও জানো না।”
অদ্রিজা ফিসফিস করে বলল,
— “কী?”
অর্ণব বন্দুকটা নিচে নামিয়ে দিল।
তারপর বলল—
— “তুমি আমার জীবনে দু’বছর আগে আসোনি, অদ্রিজা।”
অদ্রিজার শ্বাস বন্ধ হয়ে এল।
অর্ণব এক পা এগিয়ে এল।
— “তুমি আমার জীবনে এসেছিলে তারও অনেক আগে।”
— “কী বলছ?”
অর্ণবের চোখে জল চলে এল।
— “আমি তোমাকে প্রথম দেখেছিলাম সাত বছর আগে।”
অদ্রিজা মাথা নাড়তে লাগল।
— “অসম্ভব।”
— “তখন তুমি আমাকে চিনতে না।”
— “তাহলে?”
অর্ণব ফিসফিস করে বলল,
— “তখন তুমি আমাকে বাঁচিয়েছিলে।”
অদ্রিজা স্থির হয়ে গেল।
— “কোথায়?”
অর্ণব বলল,
— “একটা আগুনের রাতে।”
গুদামঘরের বাইরে বজ্রপাত হল।
অর্ণবের কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে গেল।
— “আর সেই রাতের পর তোমার স্মৃতি থেকে একটা বছর মুছে ফেলা হয়েছিল।”
অদ্রিজা কিছু বলতে পারল না।
অর্ণব এগিয়ে এসে তার হাত ধরল।
তার স্পর্শে সেই পরিচিত উষ্ণতা।
সেই মানুষটা।
সেই ভালোবাসা।
কিন্তু আজ সেই স্পর্শের ভেতরেও ছিল আতঙ্ক।
অর্ণব বলল,
— “আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
অদ্রিজার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
— “তাহলে এতদিন আমাকে সত্যিটা বলোনি কেন?”
অর্ণব উত্তর দিল,
— “কারণ সত্যিটা বললে তোমাকে আবার হারাতে হতো।”
— “আর এখন?”
অর্ণব তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “এখন হয়তো তোমাকে চিরদিনের জন্য হারাতে হবে।”
হঠাৎ বাইরে গুলির শব্দ হল।
অর্ণব অদ্রিজাকে নিজের দিকে টেনে নিল।
গুদামঘরের জানালার কাচ ভেঙে মাটিতে পড়ল।
অর্ণব চিৎকার করল—
— “নিচু হও!”
অদ্রিজা তার বুকের সঙ্গে লেগে গেল।
পরের কয়েক সেকেন্ডে চারদিকে গুলির শব্দ।
অন্ধকার।
চিৎকার।
ভাঙা কাচ।
আর অর্ণবের শক্ত হাত তাকে ঢেকে রেখেছে।
অদ্রিজা চোখ বন্ধ করেও বুঝতে পারছিল—
তার জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ মানুষটাই এখন তাকে এমন এক যুদ্ধে টেনে এনেছে, যার কারণ সে জানে না।
কয়েক মুহূর্ত পর গুলির শব্দ থামল।
অদ্রিজা ধীরে চোখ খুলল।
অর্ণব তার সামনে দাঁড়িয়ে।
তার শার্টে রক্ত।
অদ্রিজার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।
— “তুমি আহত!”
অর্ণব হেসে বলল,
— “এটা আমার রক্ত নয়।”
তারপর পিছনে তাকাল।
অদ্রিজা তাকিয়ে দেখল—
গুদামঘরের মেঝেতে একজন পড়ে আছে।
অর্ণব ফিসফিস করে বলল,
— “এখন থেকে তুমি আমাকে একটা কথাও প্রশ্ন করবে না।”
— “কেন?”
অর্ণব তার মুখ দু’হাতে ধরে বলল,
— “কারণ আজ রাত শেষ হওয়ার আগেই তোমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—”
সে থামল।
— “তুমি আমাকে বিশ্বাস করবে, নাকি নিজের চোখকে?”
অদ্রিজা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— “আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
অর্ণব তার কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে চোখ বন্ধ করল।
— “এই কারণেই তো তোমাকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই।”
তারপর সে অদ্রিজার হাত ধরে অন্ধকার গুদামঘরের পেছনের দরজার দিকে দৌড়াল।
কিন্তু তারা জানত না—
গুদামঘরের ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা তৃতীয় মানুষটি তাদের পুরো কথোপকথন শুনেছে।
তার হাতে ছিল অর্ণবের একটি পুরোনো ছবি।
ছবির পেছনে লেখা—
“অপারেশন: অদ্রিজা — শেষ ধাপ শুরু হবে ১৭ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা।”
আর ঘড়িতে তখন—
১২টা ০৭।
রাত এখনও অনেক বাকি।
৭. পালিয়ে যাওয়া
অর্ণব অদ্রিজার হাত ধরে গুদামঘরের পেছনের সরু দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল।
বাইরে তখনও প্রবল বৃষ্টি।
পায়ের নিচে কাদা।
চারপাশে অন্ধকার।
দূরে নদীর কালো জল বৃষ্টির আঘাতে কাঁপছে।
অদ্রিজা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
— “আমরা কোথায় যাচ্ছি?”
অর্ণব পিছনে তাকাল না।
— “এখান থেকে যত দূরে সম্ভব।”
— “কিন্তু তুমি আমাকে কিছুই বলছ না!”
— “এখন বললে তুমি আরও বিপদে পড়বে।”
— “আমি কি ইতিমধ্যেই বিপদে নেই?”
অর্ণব থেমে গেল।
বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে সে অদ্রিজার দিকে তাকাল।
তার চোখে এমন এক ক্লান্তি ছিল, যা অদ্রিজা আগে কখনও দেখেনি।
— “হ্যাঁ।”
অদ্রিজা ধীরে বলল,
— “তাহলে আমাকে সত্যিটা বলো।”
অর্ণব তার কাছে এগিয়ে এল।
— “আজ রাতে যদি আমরা বেঁচে থাকি, সব বলব।”
— “আর যদি না থাকি?”
অর্ণব কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল।
তারপর খুব নিচু গলায় বলল,
— “তাহলে অন্তত একটা কথা মনে রেখো।”
— “কী?”
— “তোমাকে আমি কখনও মিথ্যে ভালোবাসিনি।”
অদ্রিজার চোখ ভিজে উঠল।
সে জানত না অর্ণবের কোন কথাটা বিশ্বাস করবে।
কিন্তু সেই মুহূর্তে সে শুধু তার বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে ফেলল।
অর্ণব দু’হাতে তাকে জড়িয়ে ধরল।
বৃষ্টির মধ্যে দু’জন মানুষ কয়েক মুহূর্ত নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল।
কোনও প্রতিশ্রুতি নেই।
কোনও ভবিষ্যৎ নেই।
শুধু দুটো হৃদস্পন্দন।
অর্ণব ধীরে তার কপালে চুমু দিল।
— “আমি তোমাকে হারাতে পারব না।”
অদ্রিজা তার শার্ট আঁকড়ে ধরে বলল,
— “তাহলে আমাকে ছেড়ে যেও না।”
— “যাব না।”
সেই মুহূর্তে দূরে গাড়ির শব্দ শোনা গেল।
অর্ণব সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হয়ে গেল।
— “চলো।”
তারা দৌড়ে নদীর ধারের পুরোনো রাস্তার দিকে গেল।
কয়েক মিনিট পর একটা কালো গাড়ি এসে দাঁড়াল।
অর্ণব দরজা খুলে অদ্রিজাকে ভেতরে বসাল।
তারপর নিজে স্টিয়ারিংয়ে বসল।
গাড়ি ছুটল।
অদ্রিজা পিছনের কাচ দিয়ে তাকিয়ে দেখল—
গুদামঘরটা ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু তার মনে হল—
সেখানে তাদের অতীতের একটা অংশ পড়ে রইল।
৮. যে বাড়িতে কেউ থাকে না
প্রায় চল্লিশ মিনিট পর গাড়ি একটা নির্জন রাস্তার সামনে থামল।
অদ্রিজা জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল।
চারপাশে শুধু গাছ।
দূরে একটা পুরোনো বাড়ি।
অর্ণব বলল,
— “নামো।”
— “এটা কোথায়?”
— “আমার মায়ের পুরোনো বাড়ি।”
অদ্রিজা অবাক হল।
— “তোমার মা?”
অর্ণব কিছু বলল না।
বাড়ির দরজা খুলে তারা ভেতরে ঢুকল।
ঘরটা পুরোনো হলেও পরিষ্কার।
দেয়ালে পুরোনো ছবি।
একটা কাঠের আলমারি।
একটা পিয়ানো।
আর বড় জানালার পাশে একটা সোফা।
অর্ণব আলো জ্বালাল।
অদ্রিজা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “তোমার মা কোথায়?”
অর্ণব জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “নেই।”
— “কবে মারা গেছেন?”
— “তিনি মারা যাননি।”
অদ্রিজা থমকে গেল।
— “তাহলে?”
অর্ণব উত্তর দিল,
— “নিখোঁজ।”
অদ্রিজার বুকের ভেতর অস্বস্তি বাড়ল।
— “কত বছর?”
— “সাত।”
অদ্রিজা ধীরে বসে পড়ল।
— “সাত বছর আগে?”
অর্ণব মাথা নাড়ল।
— “যে রাতে তুমি আমাকে বাঁচিয়েছিলে।”
ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।
অদ্রিজা কিছু বলতে পারল না।
অর্ণব একটা পুরোনো আলমারি খুলল।
সেখান থেকে একটা ধাতব বাক্স বের করল।
বাক্সটা টেবিলে রাখল।
চাবি ঘুরিয়ে খুলল।
ভেতরে ছিল—
পুরোনো সংবাদপত্রের কাটিং।
কিছু ছবি।
একটা পেনড্রাইভ।
একটা ডায়েরি।
আর একটা ছোট রূপার লকেট।
অদ্রিজার চোখ লকেটটার দিকে আটকে গেল।
— “এটা…”
অর্ণব বলল,
— “তোমার।”
অদ্রিজা চমকে উঠল।
— “আমার?”
— “হ্যাঁ।”
অর্ণব লকেটটা তার হাতে দিল।
অদ্রিজা লকেট খুলল।
ভেতরে একটা ক্ষুদ্র ছবি।
একজন কিশোরী মেয়ে।
আর তার পাশে দাঁড়িয়ে একজন কিশোর।
অদ্রিজার মাথা ঘুরে উঠল।
— “এটা আমি?”
অর্ণব বলল,
— “হ্যাঁ।”
— “কিন্তু আমি তো এই ছবির কথা মনে করতে পারছি না।”
— “কারণ তোমার মনে থাকার কথা নয়।”
অদ্রিজা তার দিকে তাকাল।
— “আমার স্মৃতির সঙ্গে কী হয়েছে?”
অর্ণব ধীরে চেয়ারে বসল।
তারপর বলল,
— “সাত বছর আগে একটা দুর্ঘটনা হয়েছিল।”
— “কী দুর্ঘটনা?”
— “দুর্ঘটনা নয়।”
সে থামল।
— “ওটা পরিকল্পিত ছিল।”
৯. সাত বছর আগের রাত
সাত বছর আগে।
অর্ণব তখন মাত্র বাইশ বছরের।
তার বাবা ছিলেন একটি বড় গবেষণা সংস্থার আর্থিক বিভাগের প্রধান।
অর্ণবের মা ছিলেন সেই সংস্থার আইনজীবী।
কাগজে-কলমে তারা অত্যন্ত সম্মানিত পরিবার।
কিন্তু বাড়ির ভেতরে চলত অন্য গল্প।
এক রাতে অর্ণব তার বাবাকে কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলতে শুনেছিল।
— “ফাইলটা কাল সকালে পৌঁছে যাবে।”
অপর প্রান্তের মানুষটি কী বলেছিল সে শুনতে পায়নি।
কিন্তু তার বাবা বলেছিলেন,
— “না। ছেলেটা কিছু জানে না।”
অর্ণব বুঝতে পারেনি কথাটা কাকে নিয়ে।
সেই রাতেই তার মা তাকে ঘরে ডেকে বলেছিলেন,
— “অর্ণব, তুমি যদি কখনও আমাকে বিশ্বাস করে থাকো, আজ একটা কথা শুনবে।”
— “কী?”
— “আজ রাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবে।”
— “কোথায় যাব?”
— “যেখানেই যাও। কিন্তু বাড়িতে ফিরবে না।”
অর্ণব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল,
— “কেন?”
তার মা উত্তর দেননি।
শুধু একটা লকেট তার হাতে দিয়েছিলেন।
— “এটা রাখো।”
অর্ণব জিজ্ঞেস করেছিল,
— “এটা কার?”
তার মা বলেছিলেন,
— “যে মেয়েটা একদিন তোমার জীবন বদলে দেবে, তার।”
অর্ণব তখন হেসেছিল।
সে জানত না কথাটা কতটা সত্যি।
সেই রাতেই বাড়িতে আগুন লাগে।
অর্ণব দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে আসে।
তারপর বিস্ফোরণ।
চারদিকে আগুন।
চিৎকার।
ধোঁয়া।
আর সেই আগুনের মধ্যে অর্ণব একটা মেয়েকে দেখতে পায়।
মেয়েটা তাকে টেনে বাইরে নিয়ে এসেছিল।
সেই মেয়েটাই ছিল অদ্রিজা।
কিন্তু অদ্রিজা তখন তাকে চিনত না।
বরং তার নিজেরই মাথায় আঘাত লেগেছিল।
পরদিন হাসপাতালে তার পরিবার তাকে নিয়ে চলে যায়।
তারপর অদ্রিজার স্মৃতি থেকে সেই রাতটা ধীরে ধীরে মুছে যায়।
অর্ণব তাকে খুঁজেছিল।
কিন্তু পারেনি।
দুই বছর পর বইয়ের দোকানে যখন সে আবার অদ্রিজাকে দেখেছিল—
সে সঙ্গে সঙ্গে চিনেছিল।
কিন্তু অদ্রিজা চিনতে পারেনি।
সেদিন অর্ণব বুঝেছিল—
তার মা যে কথাটা বলেছিলেন, সেটা ভবিষ্যদ্বাণী ছিল না।
সতর্কবার্তা ছিল।
১০. অদ্রিজার ডায়েরি
অর্ণব ডায়েরিটা অদ্রিজার সামনে রাখল।
— “এটা পড়ো।”
অদ্রিজা ডায়েরি খুলল।
প্রথম কয়েক পৃষ্ঠা ফাঁকা।
তারপর একটা তারিখ।
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯।
লেখা ছিল—
“আজ আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অর্ণবকে বাঁচাতে হলে আমাকে ওর কাছ থেকে দূরে যেতে হবে।”
অদ্রিজা থেমে গেল।
— “এটা কার লেখা?”
অর্ণব বলল,
— “আমার মায়ের।”
পরের পাতায় লেখা—
“ওরা অর্ণবকে খুঁজছে। কারণ অর্ণব এমন একটা তথ্য জানে, যা ওর জানা উচিত ছিল না। কিন্তু আসল বিপদ অর্ণব নয়। আসল বিপদ হলো অদ্রিজা।”
অদ্রিজার হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।
— “আমি?”
অর্ণব মাথা নিচু করল।
— “হ্যাঁ।”
পরের পাতায় লেখা—
“অদ্রিজার বাবা যে নথিটা লুকিয়ে রেখেছিলেন, সেটা যদি ভুল মানুষের হাতে যায়, অনেক মানুষ বিপদে পড়বে। অদ্রিজা জানে না নথিটা কোথায়। কিন্তু ওর স্মৃতির মধ্যে একটা অংশ আছে, যেখানে সেই জায়গার সূত্র লুকিয়ে আছে।”
অদ্রিজা ডায়েরি বন্ধ করে দিল।
— “আমার বাবা?”
অর্ণব বলল,
— “তোমার বাবা মারা যাওয়ার আগে একটা ফাইল রেখে গিয়েছিলেন।”
— “কী ফাইল?”
— “যে ফাইলের জন্য তোমার বাবাকে হত্যা করা হয়েছিল।”
অদ্রিজা উঠে দাঁড়াল।
— “না।”
— “অদ্রিজা—”
— “না!”
তার চোখে জল।
— “আমার বাবা হার্ট অ্যাটাকে মারা গিয়েছিলেন।”
অর্ণব চুপ করে রইল।
অদ্রিজা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “তুমি এতদিন এটা জানতে?”
— “হ্যাঁ।”
— “আর আমাকে বলোনি?”
— “আমি নিশ্চিত ছিলাম না।”
— “তবুও?”
অর্ণব কাছে এল।
— “আমি তোমাকে রক্ষা করতে চেয়েছিলাম।”
অদ্রিজা পিছিয়ে গেল।
— “তুমি আমার জীবনটা মিথ্যে দিয়ে ভরে দিয়েছ।”
অর্ণব থেমে গেল।
অদ্রিজা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— “আমি তোমাকে ভালোবাসতাম বলে তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম।”
অর্ণবের চোখ ভিজে উঠল।
— “আমি এখনও তোমাকে ভালোবাসি।”
— “কিন্তু আমি জানি না তুমি কে।”
এই কথাটা অর্ণবকে যেন ভেতর থেকে ভেঙে দিল।
১১. দূরত্ব
সেই রাতে অদ্রিজা আলাদা ঘরে ঘুমাল।
অর্ণব দরজার বাইরে বসে ছিল।
রাত তিনটে।
অদ্রিজা দরজা খুলে দেখল অর্ণব মেঝেতে বসে আছে।
— “তুমি এখানে?”
অর্ণব মাথা তুলল।
— “হ্যাঁ।”
— “কেন?”
— “ভয় লাগছে।”
— “কিসের?”
অর্ণব মৃদু হাসল।
— “তুমি আমাকে আর ভালোবাসো না—এই ভয়টা।”
অদ্রিজা চুপ করে রইল।
অর্ণব বলল,
— “তোমাকে সত্যিটা বললে তুমি হয়তো আমাকে ঘৃণা করবে, জানতাম। কিন্তু তোমাকে হারানোর চেয়ে মিথ্যে বলে তোমাকে কাছে রাখা সহজ মনে হয়েছিল।”
অদ্রিজার চোখে জল এল।
— “এটা ভালোবাসা নয়, অর্ণব।”
— “জানি।”
— “তাহলে?”
— “এটা আমার দুর্বলতা।”
দু’জনের মধ্যে অনেকক্ষণ নীরবতা।
অদ্রিজা ধীরে বলল,
— “আমি তোমাকে ঘৃণা করতে পারছি না।”
অর্ণব চোখ তুলল।
— “কেন?”
— “কারণ আমি এখনও তোমাকে ভালোবাসি।”
অর্ণব উঠে দাঁড়াল।
তাদের মধ্যে কয়েক ইঞ্চি দূরত্ব।
অদ্রিজা চোখ বন্ধ করল।
অর্ণব তার মুখের কাছে এল।
কিন্তু থেমে গেল।
— “তুমি নিশ্চিত?”
অদ্রিজা চোখ খুলে তাকাল।
তারপর নিজেই অর্ণবের হাত ধরে তাকে কাছে টেনে নিল।
চুম্বনটা ছিল দীর্ঘ, গভীর, কিন্তু তাড়াহুড়ো নয়।
দু’জনের জমে থাকা অভিমান, ভয় আর ভালোবাসা যেন সেই মুহূর্তে একসঙ্গে মিশে গেল।
অর্ণব তার কপালে মাথা রাখল।
— “আমি তোমাকে আর কিছু লুকাব না।”
অদ্রিজা ফিসফিস করে বলল,
— “তাহলে সত্যিটা বলো।”
অর্ণব মাথা নাড়ল।
— “সব বলব।”
কিন্তু ঠিক তখনই—
বাড়ির বিদ্যুৎ চলে গেল।
অন্ধকার।
তারপর জানালার বাইরে একটা ছায়া নড়ল।
অর্ণব অদ্রিজাকে পিছনে সরিয়ে দিল।
— “এখানে থাকো।”
— “অর্ণব—”
— “দরজা বন্ধ করো।”
সে বন্দুক নিয়ে বাইরে গেল।
দুই মিনিট পর একটা শব্দ।
তারপর নিস্তব্ধতা।
অদ্রিজা দরজা খুলে বাইরে এল।
— “অর্ণব?”
কেউ নেই।
শুধু মেঝেতে পড়ে আছে তার ফোন।
স্ক্রিনে একটা মেসেজ।
“তুমি যদি সত্যিই অদ্রিজাকে ভালোবাসো, তাহলে আজ রাতেই তাকে নিয়ে শহর ছেড়ে চলে যাও। কারণ যে মানুষটাকে তুমি সবচেয়ে বিশ্বাস করো, সে তোমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।”
১২. বিশ্বাসঘাতক কে?
অদ্রিজা ফোনটা হাতে নিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
হঠাৎ পিছন থেকে একটা কণ্ঠ।
— “ভয় পেয়ো না।”
অদ্রিজা ঘুরে দাঁড়াল।
অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে সেই লোকটা—
যাকে গুদামঘরে সে দেখেছিল।
— “আপনি এখানে কীভাবে এলেন?”
লোকটা বলল,
— “অর্ণব আমাকে এখানে আসতে বলেছিল।”
— “কিন্তু অর্ণব তো…”
— “অর্ণবকে নিয়ে চিন্তা করো না।”
অদ্রিজা সন্দেহের চোখে তাকাল।
— “আপনি আসলে কে?”
লোকটা এবার নিজের পরিচয় দিল।
— “আমার নাম ঋত্বিক।”
অদ্রিজা বলল,
— “আপনাকে তো মৃত বলা হয়েছিল।”
ঋত্বিক হেসে বলল,
— “আমার মৃত্যুর খবরটা ছড়িয়েছিল অর্ণব নিজেই।”
অদ্রিজার বুক কেঁপে উঠল।
— “কেন?”
ঋত্বিক বলল,
— “কারণ আমরা দু’জন একই কাজ করছিলাম।”
— “কী কাজ?”
— “তোমাকে বাঁচানো।”
অদ্রিজা চুপ।
ঋত্বিক বলল,
— “কিন্তু একটা সমস্যা হয়েছে।”
— “কী?”
— “আমাদের মধ্যে কেউ একজন বিশ্বাসঘাতক।”
— “আপনি?”
ঋত্বিক মৃদু হাসল।
— “আমি হলে তোমাকে এখানে সত্যিটা বলতে আসতাম না।”
— “অর্ণব?”
ঋত্বিক এবার উত্তর দিল না।
তার বদলে একটা ফাইল অদ্রিজার হাতে দিল।
— “এটা দেখো।”
ফাইলের প্রথম পাতায় অর্ণবের স্বাক্ষর।
তারিখ—
দুই বছর আগে।
নিচে লেখা—
“অদ্রিজার স্মৃতি পর্যবেক্ষণ প্রকল্প — অনুমোদিত।”
অদ্রিজার মুখ শুকিয়ে গেল।
— “এটা কী?”
ঋত্বিক বলল,
— “তোমার স্মৃতি মুছে ফেলা হয়নি।”
— “তাহলে?”
— “তোমাকে ইচ্ছা করে ভুলিয়ে রাখা হয়েছে।”
— “কে?”
ঋত্বিক ধীরে বলল,
— “অর্ণব।”
১৩. অর্ণবের অপরাধ
অদ্রিজা বিশ্বাস করতে পারছিল না।
— “না।”
ঋত্বিক বলল,
— “প্রমাণ আছে।”
— “আমি বিশ্বাস করি না।”
— “তুমি ওকে ভালোবাসো। তাই বিশ্বাস করতে চাইছ না।”
অদ্রিজা ফাইলটা বন্ধ করে দিল।
— “আমি ওর মুখ থেকে শুনব।”
ঋত্বিক বলল,
— “সেটাই উচিত।”
ঠিক তখন দরজা খুলে গেল।
অর্ণব ফিরে এসেছে।
তার হাতে রক্ত।
অদ্রিজা তার দিকে তাকাল।
— “তুমি কোথায় ছিলে?”
অর্ণব বলল,
— “তোমাকে খুঁজতে বেরিয়েছিলাম।”
ঋত্বিক সামনে এগিয়ে এল।
— “মিথ্যে বলো না।”
অর্ণব স্থির হয়ে গেল।
তারপর ঋত্বিকের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “তুমি এখানে কেন?”
— “ওকে সত্যিটা বলতে।”
অর্ণব চোখ বন্ধ করল।
অদ্রিজা বলল,
— “তুমি কি আমার স্মৃতি নিয়ে কিছু করেছিলে?”
অর্ণব চুপ।
— “উত্তর দাও!”
অর্ণব ধীরে বলল,
— “হ্যাঁ।”
অদ্রিজার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
— “কেন?”
— “কারণ তোমাকে বাঁচাতে হতো।”
— “আমার স্মৃতি কেড়ে নিয়ে?”
— “আমি তোমার স্মৃতি কেড়ে নিইনি।”
— “তাহলে?”
— “আমি শুধু তোমাকে কিছু সত্যি থেকে দূরে রেখেছিলাম।”
— “কে তোমাকে এই অধিকার দিয়েছিল?”
অর্ণব কোনও উত্তর দিল না।
অদ্রিজা চিৎকার করে উঠল,
— “কে?”
অর্ণব এবার বলল,
— “তোমার বাবা।”
অদ্রিজা স্তব্ধ।
— “আমার বাবা?”
— “হ্যাঁ।”
— “তিনি তোমাকে বলেছিলেন?”
— “মৃত্যুর আগে।”
অর্ণব পকেট থেকে একটা পুরোনো চিঠি বের করল।
— “এটা পড়ো।”
অদ্রিজা চিঠিটা নিল।
চিঠিতে লেখা—
“অর্ণব, যদি আমার মেয়ের সঙ্গে কখনও তোমার দেখা হয়, ওকে সত্যিটা বলবে না। যতদিন না ও নিজে সত্যিটা মনে করতে পারে, ততদিন ওকে নিরাপদে রেখো।”
শেষ লাইনে—
“কারণ আমার মৃত্যুর আসল কারণ ও জানে না।”
অদ্রিজা চিঠি পড়ে কাঁদতে লাগল।
— “তাহলে আমি কী জানি?”
অর্ণব বলল,
— “তুমি জানো না যে তুমি সেই রাতের একমাত্র সাক্ষী।”
— “কিসের?”
অর্ণব বলল,
— “তোমার বাবাকে কে হত্যা করেছিল, তুমি সেটা দেখেছিলে।”
১৪. হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি
অদ্রিজা মাথা চেপে ধরল।
হঠাৎ মাথার ভেতর কিছু ছবি ভেসে উঠল।
আগুন।
একটা ঘর।
তার বাবা।
একজন কালো পোশাক পরা মানুষ।
একটা ধাতব বাক্স।
আর একটা কণ্ঠ—
“ওকে নিয়ে যাও। ও সব দেখেছে।”
অদ্রিজা চিৎকার করে উঠল।
অর্ণব তাকে ধরে ফেলল।
— “অদ্রিজা!”
— “আমি দেখেছি…”
— “কী?”
— “একজনকে।”
— “কে?”
অদ্রিজা কাঁপতে কাঁপতে বলল,
— “আমি জানি না।”
তারপর আরেকটা ছবি।
একজন মহিলা।
অর্ণবের মা।
তিনি সেই লোকটার সামনে দাঁড়িয়ে।
বলছেন—
“আপনি যা করছেন সেটা বন্ধ করুন।”
লোকটা উত্তর দিচ্ছে—
“আপনি জানেন খুব বেশি।”
তারপর—
বন্দুকের শব্দ।
অদ্রিজা চোখ খুলল।
— “তোমার মা…”
অর্ণব স্থির হয়ে গেল।
— “কী হয়েছে আমার মায়ের?”
অদ্রিজা কাঁপা গলায় বলল,
— “তিনি বেঁচে ছিলেন।”
ঋত্বিকও এগিয়ে এল।
— “তুমি নিশ্চিত?”
অদ্রিজা মাথা নাড়ল।
— “আমি তাঁকে দেখেছি।”
অর্ণবের চোখে প্রথমবার সত্যিকারের ভয় দেখা গেল।
— “কোথায়?”
অদ্রিজা বলল,
— “তোমার বাবার অফিসে।”
ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
১৫. গোপন কক্ষ
অর্ণব পুরোনো বাড়ির একটা দেয়ালের কাছে গেল।
একটা ছবি সরাল।
পিছনে ছোট একটা বোতাম।
চাপ দিতেই দেয়ালের একটা অংশ সরে গেল।
ভেতরে সরু সিঁড়ি।
অদ্রিজা অবাক।
— “এটা কী?”
— “আমার বাবা বানিয়েছিলেন।”
তারা নিচে নামল।
ভূগর্ভস্থ ঘর।
সেখানে সারি সারি কম্পিউটার।
পুরোনো ফাইল।
হার্ডড্রাইভ।
ভিডিও ক্যামেরা।
অদ্রিজা বলল,
— “এত কিছু?”
অর্ণব বলল,
— “সাত বছর ধরে আমি এই ঘরটার সন্ধান করছিলাম।”
ঋত্বিক একটা কম্পিউটার চালু করল।
স্ক্রিনে একটা ভিডিও।
তারিখ—
১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯।
ভিডিও শুরু হল।
ক্যামেরার সামনে অর্ণবের মা।
তিনি বললেন—
“যদি এই ভিডিও কেউ দেখে, তার মানে আমি আর নিরাপদ নই।”
অর্ণব নিঃশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে ছিল।
ভিডিওতে তিনি বললেন,
“আমার স্বামী যে কাজ করছিল, সেটা আমি জানতে পেরেছি। কিন্তু সবচেয়ে বড় সত্যিটা হলো—এই কাজের পেছনে আমাদের সংস্থা নয়।”
ভিডিওতে তিনি একটা নাম বললেন।
নামটা শুনে ঋত্বিকের মুখ বদলে গেল।
অদ্রিজা বলল,
— “কী হয়েছে?”
ঋত্বিক ধীরে বলল,
— “এই নামটা অসম্ভব।”
অর্ণব তাকাল।
— “কেন?”
ঋত্বিক বলল,
— “কারণ এই মানুষটা এখনও তোমার জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষ।”
ভিডিও চলতে থাকল।
অর্ণবের মা বললেন—
“ওকে বিশ্বাস কোরো না।”
তারপর ভিডিও হঠাৎ বন্ধ।
স্ক্রিন কালো।
অর্ণব ধীরে বলল,
— “কে?”
ঋত্বিক উত্তর দিল না।
অদ্রিজা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল।
হঠাৎ কম্পিউটারের পাশে একটা ছোট লাল আলো জ্বলল।
কেউ দূর থেকে সিস্টেমে ঢুকেছে।
স্ক্রিনে একটি মাত্র বাক্য ভেসে উঠল—
“তোমরা সত্যিটা খুঁজে পেয়েছ। এখন তোমাদের খুঁজে পাওয়ার পালা আমার।”
১৬. শিকার
পরের কয়েক মিনিটে তারা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল।
অর্ণব বলল,
— “আমাদের এখনই যেতে হবে।”
অদ্রিজা জিজ্ঞেস করল,
— “কোথায়?”
— “শহরের বাইরে।”
ঋত্বিক বলল,
— “ওরা আমাদের অবস্থান জেনে গেছে।”
তারা গাড়িতে উঠল।
অর্ণব এবার স্টিয়ারিংয়ে নয়।
ঋত্বিক গাড়ি চালাচ্ছিল।
অদ্রিজা অর্ণবের পাশে বসে।
অর্ণব তার হাত ধরে রেখেছিল।
কিছুক্ষণ পর অদ্রিজা বলল,
— “তুমি কি আমাকে সত্যিই ভালোবাসো?”
অর্ণব তার দিকে তাকাল।
— “এই প্রশ্নের উত্তর তুমি কতবার শুনতে চাও?”
— “যতবার না বিশ্বাস হচ্ছে।”
অর্ণব তার হাতের পিঠে চুমু দিল।
— “তাহলে যতদিন লাগবে, ততদিন বলব।”
অদ্রিজা তার কাঁধে মাথা রাখল।
— “আমি তোমাকে ক্ষমা করতে পারব কি না জানি না।”
— “ক্ষমা চাইছি না।”
— “তাহলে?”
— “শুধু তোমার পাশে থাকতে চাই।”
অদ্রিজা চোখ বন্ধ করল।
কিন্তু তাদের কেউ খেয়াল করেনি—
গাড়ির পিছনের সিটের নিচে একটা ছোট ট্র্যাকার লাগানো আছে।
১৭. হোটেল
তারা শহর থেকে প্রায় একশো কিলোমিটার দূরে একটা ছোট পাহাড়ি শহরে পৌঁছাল।
একটা পুরোনো হোটেলে উঠল।
অর্ণব ও অদ্রিজার জন্য একটি ঘর।
ঋত্বিক পাশের ঘরে।
রাত অনেক হয়ে গেছে।
অদ্রিজা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে।
অর্ণব পিছন থেকে এসে তার কাছে দাঁড়াল।
— “ঘুমাবে?”
— “ঘুম আসছে না।”
— “আমারও না।”
অদ্রিজা ঘুরে তাকাল।
— “অর্ণব?”
— “হুম?”
— “যদি সবকিছু শেষ হয়ে যায়?”
অর্ণব বলল,
— “তাহলে?”
— “আমাদের?”
অর্ণব তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “তুমি আর আমি—এটা কোনও ফাইল, কোনও ষড়যন্ত্র বা কোনও মানুষের হাতে নেই।”
সে ধীরে অদ্রিজার চুল সরিয়ে দিল।
— “তুমি চাইলে আমাদের শেষ হবে। অন্য কেউ চাইলে নয়।”
অদ্রিজার চোখ ভিজে উঠল।
— “আমি তোমাকে ছাড়তে চাই না।”
অর্ণব তাকে জড়িয়ে ধরল।
দু’জন অনেকক্ষণ একে অপরকে আঁকড়ে রইল।
অদ্রিজা তার বুকে মুখ রেখে বলল,
— “আজ শুধু আমাকে জড়িয়ে রাখো।”
অর্ণব বলল,
— “সারারাত।”
রাত গভীর হল।
তাদের মধ্যে জমে থাকা ভয় কিছুটা নরম হল।
কথার মাঝে মাঝে নীরবতা।
কপালে চুমু।
হাতের মুঠোয় হাত।
একটা দীর্ঘ আলিঙ্গন।
আর সেই অন্ধকার ঘরে দু’জন মানুষ আবার একে অপরকে বিশ্বাস করার চেষ্টা করল।
কিন্তু ভোর হওয়ার আগেই—
একটা গুলির শব্দ হল।
১৮. ঋত্বিক
অদ্রিজা ঘুম থেকে উঠে বসে পড়ল।
অর্ণব সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলে পাশের ঘরে ছুটল।
ঋত্বিক মেঝেতে পড়ে আছে।
তার কাঁধে গুলি।
অর্ণব তাকে তুলে ধরল।
— “কে করেছে?”
ঋত্বিক কষ্ট করে বলল,
— “ট্র্যাকার…”
— “কী?”
— “গাড়িতে…”
অর্ণব বুঝতে পারল।
সে জানালার দিকে তাকাল।
নীচে হোটেলের পার্কিংয়ে একটা কালো গাড়ি।
কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে।
অর্ণব বন্দুক তুলল।
লোকটা গাড়িতে উঠে পালিয়ে গেল।
ঋত্বিক বলল,
— “ওকে চিনেছি।”
অর্ণব ফিরে তাকাল।
— “কে?”
ঋত্বিকের চোখে আতঙ্ক।
— “তোমার বাবার ডান হাত।”
অর্ণব বলল,
— “অসম্ভব। সে তো…”
ঋত্বিক থামিয়ে দিল।
— “মারা যায়নি।”
অদ্রিজা ধীরে বলল,
— “তাহলে এতদিন সে কোথায় ছিল?”
ঋত্বিক উত্তর দিল,
— “তোমাদের কাছেই।”
১৯. সবচেয়ে কাছের মানুষ
তারা হোটেল ছেড়ে চলে গেল।
একটা নির্জন বাড়িতে আশ্রয় নিল।
অর্ণব পুরোনো ফাইলগুলো আবার দেখছিল।
হঠাৎ একটা ছবিতে তার চোখ আটকে গেল।
ছবিতে—
অর্ণবের বাবা।
তার পাশে একজন মানুষ।
অর্ণব সেই মানুষটাকে চিনত।
অদ্রিজাও চিনত।
তাদের দু’জনের মুখ থেকে একইসঙ্গে বেরিয়ে এল—
— “সমীর কাকা!”
সমীর ছিল অর্ণবের বাবার পুরোনো বন্ধু।
অর্ণব ছোটবেলা থেকে তাকে “সমীর কাকা” বলে ডাকত।
সে তাদের বাড়িতে আসত।
অর্ণবের মাকে চিনত।
অদ্রিজার বাবার সঙ্গেও তার পরিচয় ছিল।
আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার—
অদ্রিজার বাবার মৃত্যুর দিন সমীরই প্রথম হাসপাতালে পৌঁছেছিল।
অর্ণব ধীরে বলল,
— “এটা হতে পারে না।”
ঋত্বিক বলল,
— “তোমার বাবার সংস্থার সব গোপন তথ্য ওর কাছে ছিল।”
অদ্রিজা বলল,
— “কিন্তু ও তো আমাদের সাহায্য করত।”
ঋত্বিক তাকাল।
— “সেটাই সবচেয়ে ভালো ছদ্মবেশ।”
অর্ণব চুপ করে বসে রইল।
তারপর বলল,
— “আমাকে ওর সঙ্গে দেখা করতে হবে।”
অদ্রিজা তার হাত ধরল।
— “একাই যেও না।”
অর্ণব তার দিকে তাকিয়ে হাসল।
— “এবার আর তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না।”
২০. সমীর কাকার বাড়ি
পরদিন সন্ধ্যায় তারা শহরে ফিরে এল।
সমীরের বাড়ি পুরোনো, বিশাল।
দরজা খুলল একজন বৃদ্ধ কর্মচারী।
— “সাহেব বাইরে।”
অর্ণব বলল,
— “আমরা অপেক্ষা করব।”
তারা ভেতরে ঢুকল।
দেয়ালে পুরোনো ছবি।
অদ্রিজা একটা ছবির সামনে দাঁড়াল।
ছবিতে তার বাবা।
সমীর।
অর্ণবের বাবা।
আর—
অর্ণবের মা।
অদ্রিজা ছবিটা দেখে হঠাৎ মাথা ঘুরতে অনুভব করল।
একটা স্মৃতি।
সাত বছর আগের রাত।
সে এই বাড়িতেই এসেছিল।
তার বাবা তাকে এখানে নিয়ে এসেছিলেন।
সমীর তাকে বলেছিল—
“তুমি যা দেখেছ, কাউকে বলবে না।”
অদ্রিজা পিছিয়ে গেল।
— “আমি এখানে এসেছিলাম।”
অর্ণব তাকাল।
— “কবে?”
— “সাত বছর আগে।”
ঠিক তখন পিছন থেকে কণ্ঠ এল—
— “হ্যাঁ। এসেছিলে।”
সবাই ঘুরে দাঁড়াল।
সমীর দরজায় দাঁড়িয়ে।
বয়স্ক।
শান্ত।
পরিচিত হাসি।
— “অনেকদিন পর।”
অর্ণব বন্দুক তুলল।
— “আপনি আমার মাকে কোথায় রেখেছেন?”
সমীর হাসল।
— “তোমার মা?”
অর্ণব চিৎকার করল,
— “হ্যাঁ!”
সমীর বলল,
— “যাকে তুমি সাত বছর ধরে মৃত ভাবছ?”
অর্ণব এক পা এগিয়ে গেল।
— “উত্তর দিন!”
সমীর ধীরে বলল,
— “তোমার মা বেঁচে আছে।”
অদ্রিজা কাঁপা গলায় বলল,
— “কোথায়?”
সমীর তার দিকে তাকাল।
তারপর বলল—
— “তোমার স্মৃতির ভেতরে।”
২১. শেষ দরজা
সমীর একটা ঘরের দরজা খুলল।
ভেতরে দেয়ালজুড়ে ছবি।
অদ্রিজার ছবি।
শৈশব থেকে বর্তমান পর্যন্ত।
অর্ণবের ছবি।
তাদের একসঙ্গে তোলা ছবি।
বইয়ের দোকানের ছবি।
কফিশপের ছবি।
তাদের প্রথম দেখা।
তাদের প্রেম।
তাদের ঝগড়া।
তাদের প্রতিটি মুহূর্ত।
অদ্রিজার বুক কেঁপে উঠল।
— “আপনি আমাদের অনুসরণ করতেন?”
সমীর বলল,
— “না।”
— “তাহলে?”
— “আমি শুধু দেখছিলাম তোমরা কতটা কাছে আসো।”
অর্ণব বলল,
— “কেন?”
সমীরের হাসি মিলিয়ে গেল।
— “কারণ তোমাদের ভালোবাসাটাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় সমস্যা।”
অদ্রিজা বুঝতে পারল না।
সমীর বলল,
— “তুমি যদি অর্ণবকে ভালোবাসো, তাহলে তুমি ওকে সত্যিটা বলবে।”
— “কোন সত্যি?”
সমীর ধীরে একটা পুরোনো ভিডিও চালু করল।
স্ক্রিনে অদ্রিজার বাবা।
তিনি বলছেন—
“আমার মেয়েকে যদি কখনও অর্ণবের সঙ্গে দেখা হয়, তাকে আলাদা করবে না। কারণ অর্ণবই একমাত্র মানুষ যে সত্যিটা জানে।”
সমীর হেসে বলল,
— “তোমার বাবা জানতেন তোমাদের দেখা হবেই।”
অদ্রিজা কাঁপা গলায় বলল,
— “কীভাবে?”
সমীর উত্তর দিল,
— “কারণ তোমাদের দু’জনের জীবন সাত বছর আগে থেকেই একই গল্পের অংশ।”
২২. আসল সত্য
সমীর অবশেষে সত্যিটা বলল।
অর্ণবের বাবা ও অদ্রিজার বাবা একই গোপন প্রকল্পে কাজ করতেন।
প্রকল্পটি ছিল বিপুল অর্থের।
কিন্তু সেখানে বেআইনি কাজও চলত।
অদ্রিজার বাবা প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন।
অর্ণবের মা সেই প্রমাণ লুকিয়ে রেখেছিলেন।
সমীর সেই প্রমাণ চেয়েছিল।
সাত বছর আগে আগুন লাগানো হয়েছিল প্রমাণ নষ্ট করার জন্য।
কিন্তু অদ্রিজা দুর্ঘটনাক্রমে সব দেখে ফেলেছিল।
তার বাবা তাকে নিরাপদে পাঠাতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু যাওয়ার আগে তিনি একটি তথ্য অদ্রিজার স্মৃতিতে এমনভাবে লুকিয়ে দিয়েছিলেন যাতে কেউ জোর করে জানতে না পারে।
সেই তথ্য—
একটি পাসওয়ার্ড।
যে পাসওয়ার্ড দিয়ে পুরো গোপন নথির ভাণ্ডার খোলা যাবে।
অদ্রিজা নিজেই জানত না যে সে পাসওয়ার্ডের অংশ মনে রেখেছে।
সমীর বলল,
— “তোমাকে মেরে ফেললে তথ্যটা চিরতরে হারিয়ে যাবে। তাই তোমাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল।”
অদ্রিজা ফিসফিস করল,
— “আর অর্ণব?”
সমীর বলল,
— “অর্ণবকে ব্যবহার করা হয়েছিল তোমার কাছাকাছি যাওয়ার জন্য।”
অদ্রিজা অর্ণবের দিকে তাকাল।
অর্ণব মাথা নিচু করল।
— “প্রথমে তাই ছিল।”
অদ্রিজার চোখ ভিজে গেল।
— “প্রথমে?”
অর্ণব বলল,
— “হ্যাঁ।”
— “তারপর?”
অর্ণব তার দিকে তাকাল।
— “তারপর আমি সত্যিই তোমাকে ভালোবেসে ফেলি।”
সমীর হেসে উঠল।
— “সেটাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় ভুল।”
২৩. বন্দিত্ব
সমীরের লোকেরা তাদের ঘিরে ফেলল।
অর্ণব বন্দুক তুলতেই পিছন থেকে আঘাত এল।
সে মাটিতে পড়ে গেল।
অদ্রিজা চিৎকার করল—
— “অর্ণব!”
তারপর তার চোখের সামনে অন্ধকার।
জ্ঞান ফেরার পর অদ্রিজা নিজেকে একটা ঘরে পেল।
হাত বাঁধা নয়।
দরজা বন্ধ।
টেবিলের ওপর একটা ল্যাপটপ।
স্ক্রিনে লেখা—
“তোমার স্মৃতির শেষ অংশটা মনে করো।”
অদ্রিজা চোখ বন্ধ করল।
তার মাথায় একের পর এক ছবি।
বাবা।
আগুন।
অর্ণব।
অর্ণবের মা।
সমীর।
একটা বাক্স।
একটা পাসওয়ার্ড।
তারপর—
একটা গান।
শৈশবে তার বাবা যে গানটা গাইতেন।
অদ্রিজা বুঝল।
পাসওয়ার্ড কোনও সংখ্যা নয়।
একটা বাক্য।
তার বাবার শেষ কথা।
সে ল্যাপটপে টাইপ করল—
“ভালোবাসা সত্যিকে কখনও মারে না।”
স্ক্রিন খুলে গেল।
হাজার হাজার নথি।
ভিডিও।
ব্যাংক রেকর্ড।
নাম।
লেনদেন।
আর একটা ভিডিও।
অদ্রিজা ভিডিও চালাল।
স্ক্রিনে অর্ণবের মা।
তিনি বললেন—
“অদ্রিজা, যদি তুমি এটা দেখো, তাহলে বুঝবে অর্ণব তোমার কাছে ফিরে এসেছে।”
অদ্রিজা কেঁদে ফেলল।
ভিডিওতে তিনি বললেন—
“ওকে বিশ্বাস করো। কারণ ওকে আমি শিখিয়েছিলাম কীভাবে তোমাকে বাঁচাতে হয়।”
তারপর শেষ কথা—
“কিন্তু সমীরকে কখনও বিশ্বাস কোরো না।”
২৪. অর্ণবের প্রত্যাবর্তন
হঠাৎ দরজা ভেঙে গেল।
অর্ণব।
তার মুখে আঘাতের দাগ।
হাতে বন্দুক।
— “অদ্রিজা!”
অদ্রিজা দৌড়ে তার কাছে গেল।
তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
— “আমি ভেবেছিলাম তোমাকে হারিয়েছি।”
অর্ণব তার মাথায় হাত রাখল।
— “আমাকে এত সহজে হারানো যায় না।”
অদ্রিজা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— “আমি সব জেনে গেছি।”
অর্ণব থমকে গেল।
— “কী?”
— “তোমার মা আমাকে বিশ্বাস করতে বলেছে।”
অর্ণব চোখ বন্ধ করল।
তারপর অদ্রিজাকে জড়িয়ে ধরল।
দু’জনের চোখে জল।
কিন্তু সময় নেই।
অর্ণব বলল,
— “আমাদের বেরোতে হবে।”
— “সমীর?”
— “ও অপেক্ষা করছে।”
২৫. শেষ মুখোমুখি
পুরোনো বাড়ির ছাদে সমীর দাঁড়িয়ে।
নীচে শহরের আলো।
তার হাতে বন্দুক।
অর্ণব ও অদ্রিজা সামনে।
সমীর বলল,
— “তোমরা দু’জন সব নষ্ট করে দিলে।”
অর্ণব বলল,
— “আপনি মানুষকে ব্যবহার করেছেন।”
সমীর হেসে বলল,
— “মানুষ নিজেই ব্যবহার হতে চায়। শুধু তাকে সঠিক স্বপ্ন দেখাতে হয়।”
অদ্রিজা বলল,
— “আমার বাবাকে আপনি মেরেছিলেন?”
সমীর চুপ।
তারপর বলল,
— “হ্যাঁ।”
অদ্রিজার চোখে জল।
— “কেন?”
— “কারণ সে সত্যিটা প্রকাশ করতে চেয়েছিল।”
— “আর আপনার নিজের মানুষ?”
সমীর বলল,
— “কেউ আমার নয়।”
অর্ণব বলল,
— “তাহলে এত বছর ধরে আমাদের ওপর নজর রাখলেন কেন?”
সমীর অদ্রিজার দিকে তাকাল।
— “কারণ তোমাদের ভালোবাসা আমাকে একটা জিনিস বুঝিয়েছিল।”
— “কী?”
— “মানুষকে ভাঙতে হলে তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটাকে তার কাছ থেকে কেড়ে নিতে হয়।”
সে বন্দুক তুলল।
অর্ণব অদ্রিজার সামনে দাঁড়াল।
— “না!”
অদ্রিজা তাকে সরিয়ে দিল।
— “আজ তুমি আমাকে বাঁচাতে গিয়ে মরবে না।”
অর্ণব বলল,
— “আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না।”
অদ্রিজা তার দিকে তাকিয়ে হাসল।
— “তাহলে দু’জনেই বাঁচব।”
ঠিক তখনই পিছন থেকে ঋত্বিক এসে সমীরের বন্দুক লক্ষ্য করল।
— “শেষ।”
সমীর ঘুরতেই অর্ণব তাকে নিরস্ত্র করে ফেলল।
কয়েক মিনিট পর পুলিশ এসে পৌঁছাল।
সমীর গ্রেপ্তার হল।
২৬. সত্যি প্রকাশ
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে সব নথি প্রকাশ্যে আসে।
অদ্রিজার বাবার মৃত্যুর তদন্ত নতুন করে শুরু হয়।
অর্ণবের বাবার পুরোনো সংস্থার বিরুদ্ধে মামলা হয়।
অনেক বছর ধরে লুকিয়ে থাকা সত্যি প্রকাশ পায়।
আর সবচেয়ে আশ্চর্য ঘটনা—
অর্ণবের মা জীবিত অবস্থায় উদ্ধার হন।
তিনি বহু বছর ধরে অন্য পরিচয়ে একটি নিরাপদ জায়গায় ছিলেন।
অর্ণব যখন তাকে দেখল—
সে শিশুর মতো কেঁদে ফেলল।
তার মা তাকে জড়িয়ে বললেন,
— “আমি জানতাম তুমি ওকে খুঁজে পাবে।”
অর্ণব বলল,
— “আমি ওকে হারিয়েছিলাম।”
তার মা অদ্রিজার দিকে তাকালেন।
— “না। ও তোমাকে হারাতে দেয়নি।”
অদ্রিজা এগিয়ে এসে তার হাত ধরল।
সেই মুহূর্তে সাত বছরের অন্ধকার যেন একটু একটু করে সরে গেল।
২৭. ছয় মাস পরে
ছয় মাস পর।
শহরের সেই পুরোনো বইয়ের দোকান।
অদ্রিজা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বই দেখছে।
অর্ণব পেছন থেকে এসে বলল,
— “একটা বই খুঁজছ?”
অদ্রিজা ঘুরে তাকিয়ে হাসল।
— “হ্যাঁ।”
— “কোনটা?”
— “যেটার শেষটা ভালো।”
অর্ণব বলল,
— “বাস্তব জীবনের গল্পে শেষ ভালো হয়?”
অদ্রিজা তার হাত ধরল।
— “যদি দু’জন মানুষ শেষ পর্যন্ত একসঙ্গে থাকে, হয়।”
অর্ণব মৃদু হাসল।
— “তাহলে আমাদের গল্পের শেষ?”
অদ্রিজা মাথা নাড়ল।
— “এটা শেষ নয়।”
— “তাহলে?”
— “শুরু।”
অর্ণব তার কপালে চুমু দিল।
বাইরে আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে।
ঠিক সেই দিনের মতো—
যেদিন তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল।
২৮. শেষ চিঠি
সেদিন রাতে অদ্রিজা বাড়িতে ফিরে একটা পুরোনো খাম পেল।
খামের ওপর লেখা—
“অদ্রিজার জন্য। যখন সব শেষ হয়ে যাবে, তখন খুলবে।”
সে খাম খুলল।
ভেতরে অর্ণবের মায়ের চিঠি।
“অদ্রিজা,
তুমি হয়তো ভাবছ এত বছর ধরে তোমার জীবনে কেন এত অন্ধকার ছিল।
কারণ তুমি এমন একটা সত্যি বহন করছিলে, যার মূল্য অনেক মানুষের কাছে জীবনের চেয়েও বেশি ছিল।
কিন্তু আমি তোমাকে একটা কথা বলতে চাই।
সত্যি কখনও মানুষের জীবনকে ধ্বংস করে না। মানুষ সত্যিকে লুকিয়ে রেখে একে অপরকে ধ্বংস করে।
অর্ণবকে আমি ছোটবেলা থেকে একটা কথাই শিখিয়েছিলাম—কাউকে ভালোবাসলে তাকে নিজের করে রাখার চেষ্টা কোরো না। তাকে সত্যিটা জানার অধিকার দাও।
ও সেটা করতে পারেনি।
কারণ ও তোমাকে হারানোর ভয় পেয়েছিল।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত ও বুঝেছে—ভালোবাসা মানে কাউকে আটকে রাখা নয়।
ভালোবাসা মানে বিপদের মধ্যেও তাকে নিজের সিদ্ধান্ত নিতে দেওয়া।
তুমি যদি আজও ওকে ভালোবাসো, তাহলে ওকে একটা সুযোগ দিও।
আর যদি না ভালোবাসো, তাহলেও ওকে ক্ষমা করে দিও।
কারণ কিছু মানুষ অপরাধ করে না ভালোবাসার অভাবে।
ভালোবাসার ভয়েই ভুল করে।
— অর্ণবের মা।”
অদ্রিজা চিঠিটা বুকের কাছে ধরে রাখল।
চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
ঠিক তখন দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।
অর্ণব।
সে দরজা খুলল।
অর্ণব হাতে দুটো কফির কাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে।
— “ঘুমাওনি?”
অদ্রিজা মাথা নাড়ল।
— “না।”
— “কাঁদছিলে?”
অদ্রিজা কিছু না বলে তাকে জড়িয়ে ধরল।
অর্ণব অবাক হয়ে গেল।
তারপর ধীরে তাকে জড়িয়ে ধরল।
— “কী হয়েছে?”
অদ্রিজা ফিসফিস করে বলল,
— “কিছু না।”
— “তাহলে?”
— “তোমাকে একটা কথা বলতে চাই।”
— “বল।”
অদ্রিজা তার চোখের দিকে তাকাল।
— “আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
অর্ণব হাসল।
— “এটা তো জানি।”
— “না।”
অদ্রিজা তার হাত নিজের হাতে নিল।
— “এবার আমি জানি।”
অর্ণবের চোখ ভিজে উঠল।
সে অদ্রিজার কপালে চুমু দিল।
তারপর বলল,
— “এইবার সত্যিই কোনও রহস্য নেই।”
অদ্রিজা মৃদু হেসে বলল,
— “আছে।”
— “কী?”
— “আমাদের পরের গল্পটা কেমন হবে।”
অর্ণব বলল,
— “সেটা আমরা লিখব।”
বাইরে বৃষ্টি পড়ছিল।
শহর ঘুমিয়ে ছিল।
আর জানালার পাশে দাঁড়িয়ে দু’জন মানুষ বুঝতে পারছিল—
কিছু প্রেম গল্পের শেষ পৃষ্ঠায় শেষ হয় না।
কিছু প্রেম—
সবকিছু হারানোর পরেও বেঁচে থাকে।
উপসংহার
এক বছর পর।
একটা ছোট পাহাড়ি শহরে নতুন একটি বইয়ের দোকান খুলল।
দোকানের নাম—
“শেষ বিকেল”।
দোকানের এক কোণে বসে অদ্রিজা বই লিখছে।
আর কাউন্টারে বসে অর্ণব কফি বানাচ্ছে।
দেয়ালে একটা ছবি।
দু’জন মানুষের।
বৃষ্টিভেজা রাস্তা।
একটা পুরোনো বইয়ের দোকান।
ছবির নিচে লেখা—
“যেদিন দেখা হয়েছিল, সেদিন আমরা জানতাম না—একদিন একে অপরকে বাঁচানোর জন্য পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে।”
অদ্রিজা লেখা থামিয়ে অর্ণবের দিকে তাকাল।
— “এই যে।”
— “হুম?”
— “আমাদের গল্পের নাম কী দেব?”
অর্ণব একটু ভেবে বলল,
— “শেষ রাতের আগে।”
অদ্রিজা হাসল।
— “কেন?”
অর্ণব তার কাছে এসে বলল,
— “কারণ আমাদের জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার রাতের আগেই আমরা একে অপরকে খুঁজে পেয়েছিলাম।”
অদ্রিজা তার হাত ধরল।
— “আর যদি সেই রাত আবার আসে?”
অর্ণব তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “তাহলে এবার আমরা একসঙ্গে দাঁড়াব।”
বাইরে বৃষ্টি শুরু হল।
অদ্রিজা জানালার দিকে তাকিয়ে হাসল।
তারপর ধীরে অর্ণবের কাঁধে মাথা রাখল।
কোনও রহস্য নেই।
কোনও বন্দুক নেই।
কোনও পালিয়ে বেড়ানো নেই।
শুধু ভালোবাসা।
একটা দীর্ঘ পথ পেরিয়ে পাওয়া ভালোবাসা।
আর সেই ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর সত্যিটা ছিল—
তারা একে অপরকে বাঁচাতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেদেরও খুঁজে পেয়েছিল।
সমাপ্ত।
